সাধারণ জীবনযাপনে মধ্যে ভাষার ব্যবহার যেমন নিয়মিত ও বহু ব্যাপক, গণিতের ব্যবহারই প্রায় সে রূপ। তবে পার্থক্য এই যে, ভাষার ব্যবহার সকলের কাছে যেমন সহজ ও সরল গণিতে সেরূপ নয়। প্রচলিত ও সহজ অর্থে গণিত দূরহো ও জটিল। সাধারণ লোক গণিতকে সংখ্যা স্বাস্থ্য বলে ধরে নিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ লোকের ধারণার সঙ্গে সঙ্গে গণিত শিক্ষার্থী বাস শিক্ষকের ধারণা পৃথক তারা বিষয়টিকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করে তার প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করার চেষ্টা করেন।
ইংরেজিতে ম্যাথমেটিক শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ Mathin যার অর্থ শিক্ষা করা। অর্থাৎ ম্যাথমেটিক্স হচ্ছে সেই বিষয়ে যা সকলের আগে এবং সকলের ওপর শিক্ষা করতে হবে। গ্রিকরা গণিতকে একটি গভীর ও ব্যাপক অর্থ দিয়েছেন। অনেকে মনে করেন ম্যাথমেটিক শব্দটি এসেছে mathemata যার অর্থ শিক্ষণীয় বিষয়।
বিভিন্ন দার্শনিকের মতে গণিত তার অর্থ তুলে ধরা হলো
দার্শনিক Mall: John Stuart Mill (জন স্টুয়ার্ট মিল)-এর গণিত সম্পর্কিত দর্শন পাওয়া গেছে, যিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক।যদি আপনি জন স্টুয়ার্ট মিল-এর কথা বলে থাকেন, তবে এক কথায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি হলো:তিনি গণিতকে অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান (Empirical Knowledge) এবং এর বিবৃতিসমূহকে ভৌত বস্তুর (Physical Objects) সম্পর্কে সাধারণ দাবি মনে করতেন, যা প্রকৃতিবাদী (Naturalistic) এবং অভিজ্ঞতাবাদী (Empiricist) বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দার্শনিক Humo, Decon ওই মতামতকে সমর্থন করে তা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে গেছেন।
গণিতবিদ Laplace: গণিতবিদ Pierre-Simon Laplace (পিয়েরে-সিমন ল্যাপলাস)-এর কথা বলে থাকেন, তবে গণিত সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির মূল কথাটি হলো:নির্ণেয়তা (Determinism)এক কথায়, ল্যাপলাস মহাবিশ্বকে একটি নির্ণেয় (Deterministic) ব্যবস্থা হিসেবে দেখতেন, যেখানে গণিত ছিল সেই ব্যবস্থাটিকে বোঝার এবং ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেওয়ার একমাত্র হাতিয়ার। তিনি বিখ্যাতভাবে বলেছিলেন যে, যদি একটি বুদ্ধিমান সত্তা (যা পরে ল্যাপলাসের দৈত্য বা ‘Laplace’s Demon’ নামে পরিচিত হয়) কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে মহাবিশ্বের সমস্ত কণাগুলির অবস্থান এবং গতিবেগ জানতে পারত, তবে সেই সত্তা একটি একক সূত্রে সেগুলির অতীত ও ভবিষ্যৎ গতিবিধিকে ধারণ করতে পারত।তিনি সম্ভাবনা তত্ত্বকেও গণিতের একটি শাখা হিসেবে দেখতেন যা আমাদের অজ্ঞতার একটি পরিমাপ, প্রকৃতির অন্তর্নিহিত কোনো অনিয়মিততা (Randomness) নয়। তাঁর মতে, “সম্ভাবনা তত্ত্ব মূলত সাধারণ জ্ঞানকে ক্যালকুলাসে নামিয়ে আনা ছাড়া আর কিছুই নয়।”
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ Lord John Maynard Keynes: (লর্ড জন মেনার্ড কেনস) গণিতকে এক কথায় যুক্তি বা ফিলসফি-র অধীনে রাখতে চাইতেন।
- তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির মূল কথাটি হলো:
- যুক্তি (Logic) বা দর্শন (Philosophy)তিনি গণিতের ব্যবহারকে যুক্তি (Logic) ও ধারণাগত যুক্তির (Conceptual Reasoning) চেয়ে উচ্চ স্থান দিতেন না।
- তাঁর মতে, ফর্মাল পদ্ধতি বা গণিত ব্যবহারের আগে দর্শন (Philosophy) বা যুক্তি (Logic)-কে অবশ্যই প্রয়োগের তত্ত্বাবধান করতে হবে।
- তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল, “গণনা করার আগে কারণ” (ratio ante computationem)।অর্থনীতিতে ছদ্ম-গণিত (Pseudo-mathematics) বা দুর্বল গাণিতিক মডেলের ব্যবহারের তিনি তীব্র বিরোধী ছিলেন, যা তিনি মনে করতেন যে “অ-গণিতবিদদের এক কৃত্রিম নান্দনিক সন্তুষ্টি” দেয়।
- তাঁর গ্রন্থ A Treatise on Probability (১৯২১)-এ, তিনি সম্ভাবনাকে গাণিতিক পরিমাণের চেয়ে জ্ঞান ও প্রমাণের মধ্যে এক যৌক্তিক সম্পর্ক (Logical Relation) হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, সম্ভাবনা হলো যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাসের মাত্রা (degree of rational belief)।
দার্শনিক এবং গণিতবিদ Frank P. Ramsey (ফ্রাঙ্ক পি. রামসে) গণিতকে এক কথায় যুক্তি বা স্বতঃপ্রমাণ (Tautology)-এর সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছিলেন।
এক কথায় তাঁর মূল দৃষ্টিভঙ্গি হলো:
- যতঃপ্রমাণ (Tautology)
- রামসে প্রধানত লজিসিজম (Logicism)-এর ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন, যা মনে করে গণিত হলো যুক্তিরই একটি অংশ।
- বিশুদ্ধ গণিত: তিনি গণিতের সূত্র বা বাক্যগুলিকে এমন সম্পূর্ণ সাধারণ বাক্য (Completely General Propositions) হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন যা স্বতঃপ্রমাণ বা টোটোলজি-তে (Tautology – যে বাক্য সর্বদা সত্য, এর ভেতরের অংশগুলো সত্য বা মিথ্যা যাই হোক না কেন) পরিণত হয়। অর্থাৎ, গাণিতিক সত্যগুলি বিশ্বের নির্দিষ্ট কোনো কিছু সম্পর্কে নয়, বরং আমাদের যুক্তির কাঠামোর মধ্যেই সত্য।
- সম্ভাবনা: সম্ভাবনা তত্ত্ব নিয়ে তাঁর কাজ ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। তিনি সম্ভাবনাকে বিষয়ভিত্তিক বিশ্বাস বা আংশিক বিশ্বাসের যুক্তি (Logic of Partial Belief) হিসেবে দেখেন, যা থেকে আধুনিক সিদ্ধান্ত তত্ত্ব (Decision Theory) এবং ইউটিলিটি তত্ত্ব (Utility Theory)-এর জন্ম হয়। এই অর্থে, গণিত হলো যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি ভিত্তি।
- রামসে প্রধানত লজিসিজম (Logicism)-এর ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন, যা মনে করে গণিত হলো যুক্তিরই একটি অংশ।
বিখ্যাত গণিতবিদ Euclid (ইউক্লিড)
যাকে “জ্যামিতির জনক” বলা হয়, গণিতকে এক কথায় নিশ্চিত জ্ঞান বা স্বতঃসিদ্ধ-এর উপর ভিত্তি করে একটি সুসংগঠিত যুক্তি ব্যবস্থা (Deductive System) হিসেবে দেখতেন।
এক কথায় তাঁর মূল দৃষ্টিভঙ্গি হলো: নিশ্চিত প্রমাণ (Proof) বা স্বতঃসিদ্ধ (Axioms)
ইউক্লিডের অবদান শুধুমাত্র নতুন গাণিতিক তথ্য আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি বিদ্যমান জ্ঞানকে একটি সুসংহত যৌক্তিক কাঠামোয় সংগঠিত করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Elements-এর মাধ্যমে:
- স্বতঃসিদ্ধের উপর ভিত্তি: তিনি কিছু স্বতঃসিদ্ধ (Axioms/Postulates) বা বিনা প্রমাণে ধরে নেওয়া মৌলিক সত্য দিয়ে শুরু করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই প্রাথমিক সত্যগুলি স্বজ্ঞাতভাবে অনস্বীকার্য (intuitively obvious)।
- নিশ্চিত প্রমাণ: এই স্বতঃসিদ্ধগুলো থেকেই যৌক্তিক নিয়মের মাধ্যমে প্রতিটি উপপাদ্যকে (Theorem) নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব। তাঁর এই পদ্ধতি দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক চিন্তাধারায় সত্য এবং নিশ্চয়তার প্রতিমান হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
সংক্ষেপে, ইউক্লিডের কাছে গণিত ছিল স্বতঃসিদ্ধ থেকে যৌক্তিক নিয়মে নিশ্চিত সত্যে পৌঁছানোর একটি পদ্ধতি।
Wenstrass, Peano, Russel প্রমুখ বণিজবীদ মনে করেন চরম নির্ভুলতায় গণিতের লক্ষ্য। গণিত সত্যগুলি নিশ্চিত এবং অবিশ্য। গাণিতিক আরোহ পদ্ধতিতেই হনুমানগুলির সত্যতা যাচাই করে নেওয়া উচিত
George Boole, Russel প্রভৃতি গণিতজ্ঞগণ অমরত্ব প্রতীকের সাহায্যে গণিতের আবশ্যিক পদ্ধতি গুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
Locke এর মতে একমাত্র গণিতই আমাদের নির্ভুল যুক্তিসম্মত চিন্তনের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে।
Main Category: Mathematics Teaching Method: Interview Preparation