যে সমস্ত কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায় তার মূলে আছে কতগুলো মনোবৈজ্ঞানিক উপাদান, সেগুলিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে একটি হল বংশগতি ধারায় প্রাপ্ত এবং কিছু পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন করতে গিয়ে বিভিন্ন স্তরে শিশুর দ্বারা অর্জন।
প্রবণতা (Aptitude)
সাধারণ অর্থ: প্রবণতা হলো ব্যক্তির অনার্জিত সুপ্ত ক্ষমতা যার সাহায্যে ব্যক্তি কোন পারদর্শিতা অর্জনে সমর্থ হয় বা কোন কাজ সফল হওয়ার প্রয়োজনীয় ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
মনোবিদ Bingham এর মতে: প্রবণতা হল ব্যক্তির মধ্যে বর্তমান এমন কতকগুলি বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি যেগুলি যথাযথ শিক্ষার প্রভাবে ব্যক্তিকে বিশেষ ধর্মী কোন জ্ঞান, কৌশল বা আচরণে সমর্থ করে।
প্রবনতার বৈশিষ্ট্য
- প্রবণতা হল ব্যক্তির বিশেষধর্মী শক্তি।
- প্রবণতা হলো বিশেষ দক্ষতা যা শিক্ষা গ্রহণের পূর্বেই কোন বিশেষ ধর্মী কাজ করার জন্য ব্যক্তির অন্তর্নিহিত শক্তি। এটি দক্ষতা ও উৎকর্ষের মতো শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার ফল নয়।
- প্রবণতা জন্মগত হলে উপযুক্ত পরিবেশ ছাড়া প্রকাশ লাভ করে না।
- সব বিষয়ে প্রবণতার মাত্রা একই রকম হয় না
- একই ব্যক্তির বিভিন্ন বিষয়ে প্রবণতা থাকতে পারে।
- প্রবণতা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
- প্রবণতা চিরস্থায়ী এবং অপরিবর্তনীয়।
দক্ষতা ( Skills)
আধুনিক মনোবিদ্যা মতে: দক্ষতা এমন এক ধরনের জটিল প্রক্রিয়া যার মধ্যে অনেকগুলি কর্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয়ের কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পাদিত হয় এবং ফলাফল হিসাবে ব্যক্তি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোন কিছু সম্পাদন করতে পারে।
দক্ষতার বৈশিষ্ট্য:
- দক্ষতা কতকগুলি সঞ্চালন মূলক কাজের একটি জটিল সমন্বয়। যেখানে স্টিমুলাস রেসপন্স পরপর শৃংখলভাবে কাজ করে। শৃংখলে এক একটি উদ্দীপক প্রতিক্রিয়া সংযোগ পরবর্তী উদ্দীপক প্রতিক্রিয়া সংযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। এগুলি মূলত পেশীগত।
- দক্ষতা মূলক কাজে বিভিন্ন ইন্দ্রেয়ের ক্রিয়ার সমন্বয়ে ঘটে। যেমন জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সঙ্গে চোখ এবং তার সঙ্গে পেশী।
- দক্ষতা শিখন সাপেক্ষ। তাই দক্ষতা অর্জন করতে হয়।
- দক্ষতার ফলে যে আচরণগত পরিবর্তন হয় তা আচরণগত গুণগত মান বৃদ্ধি করে।
- সম্পর্কযুক্ত দক্ষতাগলিতে, একটি কাজের দক্ষতা অপর একটি কাজকে খুব অল্প সময়ে করতে সাহায্য করে।
- কিছু দক্ষতা আছে যা অন্য কাজের দক্ষতা অর্জনকে বাধা দেয় এদেরকে বলা হয় বিপরীত ধর্মী দক্ষতা।
- দক্ষতা সংশোধন মূলক অর্থাৎ কর্ম সম্পাদনের সময় প্রয়োজনীয়তার উপাদান গুলির পুনর্বিন্যাস ঘটাতে পারে।
দক্ষতা শ্রেণীবিভাগ:
- দৈহিক সক্রিয়তার ভিত্তিতে:
- সামগ্রিক দক্ষতা (যে সমস্ত দক্ষতা মূলক কাজের দেহের সমস্ত পেশুগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে যেমন ফুটবল খেলা বল খেলা)
- বিশেষধর্মী দক্ষতা ( যে সমস্ত দক্ষতামূলক কাজে দেহের একটি কর্মেন্দ্রিয় বা তাদের সংযোগ গুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে যেমন আঙুল দিয়ে কিছু নাড়াচাড়া করা, কোন কিছুকে শক্ত করে ধরা)
- যান্ত্রিক দক্ষতা ( যে সমস্ত দক্ষতা মূলক কাজের বিভিন্ন যন্ত্র পরিচালনার জন্য বিশেষধর্মী দৈহিক বা বেশি গত সক্রিয়তার প্রয়োজন সেগুলিকে বলা হয় যান্ত্রিক দক্ষতা যেমন টাইপ করা, এরোপ্লেন চালানো, গাড়ি চালানো)
- জটিলতার তারতম্যের ভিত্তিতে:
- সরল দক্ষতা ( যে সমস্ত কাজ দেহ স্থির অবস্থায় থাকার সময় শুরু হয়: যেমন ছুঁতে সুতো ঢুকানো, ক্যামেরায় ছবি তোলা)
- জটিল দক্ষতা: যে সমস্ত দক্ষতামূলক কাজে দেহের বিভিন্ন অংশ স্থির থাকে কিন্তু পরিবেশের গতিশীলতার কারণে কিছু সময় দেহের গতিশীলতা ( যেমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বল খেলা দেখতে দেখতে বল আশায় হঠাৎ করে বলটি ধরতে যাওয়া)
- যৌগিক দক্ষতা: যে সমস্ত কাজে ব্যক্তি ও পরিবেশ উভয়ের গতিশীল হয়ে পড়ে। ( যেমন হাঁটার সময় বিভিন্ন বেশি গুলি চলাচল করে)
দক্ষতা শিখন এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আর এই শিখন এর তিনটে পর্যায়ে আছে
১. জ্ঞানমূলক পর্যায়ে ( ব্যক্তিকে যে দক্ষতা অরন করতে হবে সে সম্বন্ধে ব্যক্তিকে জ্ঞান নিতে হবে।)
২) এসোসিয়েশন পর্যায়: ( পূর্বে অর্জিত নির্ধারিত দৈহিক আচরণ গুলির মধ্যে সংযোগ সাধন করে পরবর্তী উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্কগুলির মধ্যে যথাযথ সমন্বয় করতে হবে)
৩) সক্রিয়তার স্তর: এই পর্যায়ে দক্ষতা শিপনের শেষ পর্যায়ে। এই পর্যায়ে শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুনরাবৃত্তি করে এই প্রক্রিয়ায় নির্ভলতা অনেকটাই বেশি হয়। এই পর্যায়েটি প্র্যাকটিসের ফলাফল।
দক্ষতা শিখন এ শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
মনোভাব( Attitude)
মনোভাব হল একপ্রকার জৈব মানসিক প্রাক্ষমূলক স্থায়ী মানসিক অনুভূতিমূলক প্রক্রিয়া, যা কোন বিশেষ বস্তুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।
মনোভাবের বৈশিষ্ট্য:
- মনোভাব বিষয়গত।
- মনোভাব ঘনত্ব এবং ঋণাত্মক উভয় প্রকার গতি বিশিষ্ট।
- মনোভাবের কোয়ালিটেটিভ এবং কোয়ানটিটেটিভ উভয় দিক থেকে পার্থক্য থাকতে পারে।
মনোভাবের প্রকারভেদ:
Associative: যে সমস্ত মনোভাব মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ বা সংযোগ সৃষ্টি করে। যেমন প্রেম, প্রীতি ও ভালোবাসা
Dissociative: যেসব মনোভাবের জন্য মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়। যেমন হিংসা, ঘৃণা ও সন্দেহ
Respective: মানুষের মধ্যে এমন মনোভাব দেখা যায় যা মেলামেশার ক্ষেত্রে এক ইতস্তত বা বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে, যার ফলে সামাজিক সম্পর্ক সংকুচিত হয়। যেমন শ্রদ্ধা ভক্তি, বিনয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইত্যাদি।
অনুরাগ( Interest)
অনুরাগ ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে জড়িত বিষয়ের প্রতি আগ্রহ। যেমন ওই ব্যক্তির অর্থের প্রতি অনুরাগ আছে। মানে ওই ব্যক্তি অর্থকে ভালোবাসে।
অনুরাগের বৈশিষ্ট্য:
ম্যাকডুগাল এর মতে: প্রাণীর প্রবৃতিগত প্রবণতা যেটা তার করতে ভালো লাগে।
মূল্যবোধ (Values)
মূল্যবোধ এক ধরনের জৈব মানসিক প্রবণতা। মূল্যবোধ ব্যক্তির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আচরণ সৃষ্টি করে, যেটি অন্যান্য প্রাণীদের চাইতে সেই প্রাণীকে গুণগতভাবে, আকর্ষণীয়ভাবে, সামাজিক স্বীকৃতির দিক থেকে উত্তম মানে প্রতিষ্ঠিত করে।
মূল্যবোধ বিভিন্ন উদ্দীপক বা পরিস্থিতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে ব্যক্তিকে উন্নত আচরণ করতে শক্তি যোগায়।
মূল্যবোধ ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। এবং আচরণের মধ্যে বিশেষ মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে।
মূল্যবোধ বিকাশধর্মী।
মূল্যবোধের বিকাশ সামাজিক পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। যে সামাজিক পরিবেশে ব্যক্তি বসবাস করে মূল্যবোধ বিকাশের ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করে।
মূল্যবোধ পরিবর্তনশীল।
মূল্যবোধের শ্রেণীবিভাগ
বাহ্যিক মূল্যবোধ: সামাজিক, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক, গণতান্ত্রিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও ধার্মিক মূল্যবোধ।
অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধ:
সত্য, সুন্দর, শান্তি, আনন্দ ও ভালোত্ব।
মূল্যবোধের উৎস:
অভিভাবক ও পরিবার।
বন্ধু।
শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
আদর্শ প্রকৃতি।
সামাজিক এবং সাংস্কৃতি ঐতিহ্য।
ধর্মীয় বিষয়াদি।
প্রথার, রীতিনীতি ও সংবিধান
